ঢাকা, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯ ফাল্গুন, ১৪৩২, ৪ রমজান, ১৪৪৭
সর্বশেষ
মেয়র ও সাংবাদিক পাল্টাপাল্টি তর্ক :আইনি বিতর্কের বদলে ব্যক্তি–কেন্দ্রিক বিতর্ক
দুস্থদের ইফতার সামগ্রী প্রদান এমপি আবু সুফিয়ান:চট্টগ্রাম নতুন ব্রিজঅটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়ন
দেশটার জন্য শুভ কামনা ছাড়া আর কিছু বলার নেই!
একুশের চেতনা ও একুশ শতকের বাংলাদেশ:মোঃ শহীদুল ইসলাম
চাকরি হারালেন নির্বাচন কমিশনের ১৫ কর্মী
খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে আলোচিত সমালোচিত :নেতাকর্মীরা বিব্রত
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়ে প্রশ্ন
ইপসা আয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন, কমিউনিটির সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান এমপি আবু সুফিয়ানের
ওয়াসায় কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে বিভ্রান্তি, সংগঠনের প্রতিবাদ
বই মেলায় আসছে ভালবাসার কবি গোলাম মাওয়া জসিমের ৩টি বই

প্রচ্ছদ >

অন্যান্য

দেশটার জন্য শুভ কামনা ছাড়া আর কিছু বলার নেই!

 

নির্বাচনের ৩ দিন আগে বাংলাদেশ আমেরিকার সাথে তড়িঘড়ি করে একটা বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে। প্রথমে মনে হতে পারে, এটা বুঝি দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য করা একটা মামুলি চুক্তি, কিন্তু পড়তে পড়তে আপনার মনে হবে, কেউ তার দেশকে কতটা ঘৃণা করলে, কতটা স্বার্থান্বেষী হলে— নিজ দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে এরকম একটা চুক্তি করতে পারে!

এই চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আাসা প্রায় সাড়ে ৪ হাজারের বেশি পণ্যের ওপর হয় শুল্ক কমাতে হবে বা সেটাকে শূন্যতে নামিয়ে আনতে হবে। ফলে দেশকে হারাতে হবে বিশাল পরিমাণে রাজস্ব আয়! কিন্তু ওরা যখন আমদানি করবে সেটা ওদের মর্জির ওপর নির্ভর করবে। ব্যাপারটা এরকম যে, বাংলাদেশ আমেরিকার জন্য তার দরজা পুরোটা খুলে দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দরজা খোলা রাখবে কি না, তা পুরোপুরি তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

যেসব পন্য নিয়ে চুক্তি হয়েছে সেটা শুনলেও বিস্মিত হতে হয়। কৃষিজাত পণ্য থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য, ওষুধ, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, মাংস, চিজ- কি নেই সেই তালিকায়।

৫.১ নম্বর ধারার অংশবিশেষটা এরকম: যুক্তরাস্ট্র খনিজ সম্পদ উত্তোলন থেকে শুরু করে অনুসন্ধান, পরিবহণ, বিতরণে সরাসরি অংশ নেবে, সেখানে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগ আমেরিকাকে ‍দিতে হবে। ধরেন পেট্রোবাংলা খনিজ অনুসন্ধান করে, এখন আমেরিকার একটা কোম্পানি চলে আসলে পেট্রোবাংলার অস্তিত্ব থাকবে?

আরেকটা উদাহরণ দেই, ধরেন, ঔষধ বাংলাদেশে বিকাশমান একটা শিল্প। এখন আমেরিকা থেকে ট্যাক্স ফ্রি ঔষধ দেশে আসতে শুরু করলে, বা ওখানকার কোম্পানি এখানে এসে ঔষধ বানানো শুরু করলে এখানকার একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে পারবে? আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতায় পড়ে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প শেষ হয়ে যাবে না? তাও এসবের জন্য আমেরিকাকে কোনো ট্যাক্স দেয়া লাগবেনা? এটা কি করে সম্ভব?

শুধু তাই না, শতশত আমেরিকান পণ্য যখন বাংলাদেশে ঢুকবে, চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশ কোনো ধরনের কোটা আরোপ করতে পারবেনা, কোনো ধরনের পরীক্ষা বা মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, আমেরিকা যা বলবে ওটাই সই।

ধরেন বিএসটিআই এর মত প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে আমেরিকা থেকে আসা খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিক আছে, বীজ বাংলাদেশের তিনফসলি জমির জন্য উপযোগী না, কীটনাশক ব্যবহার করলে ক্ষতিকর আগাছা বাড়বে, দরকারি কীটপতঙ্গ সব মরে যাবে, সেটা তারা বলতে পারবে না। আমেরিকা থেকে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসন, খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, BSTI- সবাই নিধিরাম সর্দার হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখবে।

চুক্তিতে আছে, বাংলাদেশে শ্রম আইন হতে হবে যুক্তরাস্ট্রের পছন্দ মত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যে স্ট্যান্ডার্ড সেটা এখানে খাটবেনা। কোনো কারণে বাংলাদেশ যদি শ্রম আইন মানার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একতরফা শাস্তি দিতে পারবে। ধরেন যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে যে, ইপিজেডে যে শ্রম অধিকার নীতিমালা আছে ওটা যথেষ্ট না, তারা বাংলাদেশের পোশাকের ওপর শুল্ক বাড়াতে পারবে, এক্ষত্রে আমাদের কিছু করার থাকবেনা।

বাংলাদেশ ডেটা লোকালাইজেশন করতে পারবে না, ডিজিটাল সার্ভিসের ওপর ট্যাক্স বসাতে পারবেনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নীতি সমন্বয় করতে হবে। তার মানে হল, যদি বাংলাদেশ Facebook/Google কে স্থানীয়ভাবে সার্ভার স্থাপন করতে বলে, আমাজানকে তার বেচা পণ্যের ওপর ট্যাক্স দিতে বলে সেটা বলতে পারবেনা। গোটা ডিজিটাল অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

ধরেন, যুক্তরাস্ট্রের বাইরে বাংলাদেশ চীনের সাথেও প্রযুক্তি নিয়ে ব্যবসা করে, এই মুহুর্তেও করে। এখন আমেরিকা চাইলে বাংলাদেশ অবশ্যই চীনের সব কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করতে বাধ্য থাকবে বাংলাদেশ, কারণ চুক্তিতে পরিস্কার বলা আছে, ”যুক্তরাষ্ট্র কোনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে একই ব্যবস্থা নিতে হবে, বাংলাদেশ তৃতীয় দেশের কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবে, বাংলাদেশ আর কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি কিনতে পারবে না।”

এটা একটা দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতিকে স্রেফ বিক্রি করে দেওয়ার শামিল না? তার মানে বাংলাদেশের গোটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্ভর করবে আমেরিকা কি চায় তার ওপর।

শুধু তাই না, বাংলাদেশের নিজস্ব একটা কোম্পানি বিনিয়োগ করার সময় যেসব সুবিধা পাবে, আমেরিকার একটা কোম্পানিকেও এসব সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু আমেরিকার কোম্পানি যদি পরিবেশ দূষণ করে, তারজন্য বাংলাদেশ তাকে শাস্তি দিতে পারবেনা। এখন আমেরিকার একটা কোম্পানির সাথে লাল-তীর কি আর দাঁড়াতে পারবে? লাল তীর যদি কোনো কারণে বিপদে পড়ে তাকে আবার সরকার ভর্তুকি দিতে পারবেনা- সেটাও পইপই করে বলা আছে।

দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলে সেটা যেই অমান্য করে, শাস্তিওতো সমান হওয়ার কথা, নাকি? এটাতো একটা সভ্য চুক্তির বেসিক। কিন্তু এক্ষেত্রে এসবের বালাই নাই। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তি মানেনি, তাহলে সাথে সাথে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক বসাতে পারবে, কিন্তু যুক্তরাস্ট্র যদি না মানে? বাংলাদেশ কোনো প্রতিকারতো পাবেইনা, প্রতিকার চাওয়ার জন্য কোনো নিরপেক্ষ সংস্থার কাছেও যেতে পারবেনা।

ছয়টা চ্যাপ্টারের ২৯টা ধারা, এবং ২০০ এর বেশি উপধারা আছে এই চুক্তিতে, সাথে আছে তিনটা সংযুক্তি। চুক্তির কপিটা ৩২ পৃষ্ঠা। তুলা কিনলে গার্মেন্টস পণ্যে ছাড় পাওয়া যাবে, আর শুল্ক ১% কমিয়ে ১৯% করা হয়েছে- এই একটা লাইন ছাড়া গোটা ডকুমেন্টে একটা শব্দও নাই, যেখানে বলা হয়েছে যে, এই চুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের কোনো লাভ হবে। বাকি সমস্ত লাভ আমেরিকার!

তাও তুলা কেনার ব্যাপারটা শুভংকরের ফাঁকি! কেমনে সেটা একটু বলি-

বাংলাদেশ তুলা আমদানি করে মূলত: ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, উজবেকিস্তান, পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ বেশি, ২৫-৩০% এর মত, এর পেছনে কারণ আছে।

ভারতের তুলা দামে সস্তা, স্থল ও সমুদ্র দিয়ে আসতে পারে বলে পরিবহণ খরচ কম, অর্ডার দেয়ার ৭-১০ দিনের ভেতর চলে আসে, ফলে সেই তুলা মজুদ করতে হয়না। ভারতীয় তুলার মান মাঝাারি, কিন্তু স্পিনিং মিলের জন্য ঠিক আছে।

আমেরিকার তুলার দাম বেশি, অর্ডার দিলে দেশে আসতে সময় লাগে ৩০-৪৫ দিন, পরিবহণ খরচ বেশি, তবে তুলার মান ভারতের চেয়ে ভাল। এই তুলা সাধারণত খুব ব্যয়বহুল জামাকাপড়ের জন্য ব্যবহার হয়। তার মানে খরচ বাঁচে এরকম উৎস বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জন্য বেস্ট চয়েজ হল ভারত ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ।

এখন ইউনূস সরকারের পিআর গ্রুপ প্রচার করছে, তুলা কিনলে বাংলাদেশে গার্মেন্টস পণ্য ফ্রিতে আমেরিকা ঢুকতে পারবে। ডাহা মিথ্যা কথা। যুক্তরাস্ট্র এই শর্ত দিয়ে রাখছে যে, তুমি আমার কাছ থেকে তুলা কিনলে ওই তুলা দিয়ে বানানো পোশাকের উপর কোনো শুল্ক বসাবো না। মানে ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক যদি তুমি বছরে রপ্তানি করো, তাহলে আমার কাছ থেকে যেটুকু তুলা কিনবা, ওইটুকুর মধ্যে আমার দেশে যেটুকু ঢুকবে ওটার উপর শুল্ক মাফ।

এখন বাংলাদেশতো তার মোট পোশাকের মাত্র ১৮%-২০% আমেরিকায় রপ্তানি করে। কিন্তু দেখেন সে কিন্তু ১৮% আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ১০০% তুলা কিনতে বাধ্য করতেছে।

এই কারণে বিরাট বিপদে পড়বে বাংলাদেশ। আমেরিকার ওপর বাণিজ্য নির্ভরতা তৈরি হবে, তুলা কেনার শর্ত মানবে হবে! শুধু যুক্তরাস্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে বাংলাদেশ কম দামি পোশাক বানাবে কি করে, কারণ পোশাক উৎপাদনের খরচ বাড়বে। এর মানে হল পোশাকের বিরাট এক বাজার হারাবে বাংলাদেশ। যে দেশের ৭০%–৮০% স্পিনিং মিল ভারতীয় বা আফ্রিকান তুলা দিয়ে চলে, সে হঠাৎ করে বেশি দামের তুলার ব্যবহার শুরু করলে তার সেই পোশাব কিনবেটা কে?

….

বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এই চুক্তি সম্পর্কে তারা অবগত কিনা আমি জানিনা। কিন্তু এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই চুক্তি থাকলে বিএনপির পক্ষে সরকার চালাতে হিমশিম খেতে হবে।

আবার চুক্তি বাতিল বা নতুন করে রিভিউ করার সাহস বাংলাদেশ পাবে বলে মনে করিনা।

আমেরিকার বিরুদ্ধে গেলে তৃতীয় বিশ্বের সরকার প্রধানদের কিভাবে মূল্য দিতে হয়; সেটা আমরা সম্প্রতি দেখেছি। কাউকে দিল্লীতে আশ্রয় নিতে হয়, তাহির জেলে পঁচতে পঁচতে কারো চোখ হারানোর উপক্রম হয়, কাউকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে ব্রুকলিনের কুখ্যাত কারাগারে নিক্ষিপ্ত করা হয়।

আমার এক শিক্ষক সেদিন বলছিলেন, তুমি ব্রাসেলসে হাঁটার সময় রাস্তায় যত মানুষ দেখবা, জেনে রাখবা যে প্রতি ১০ জনের একজন হলো লবিস্ট বা দালাল।

এই চুক্তিটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমরা গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী যে সরকার পেয়েছিলাম সেটা আসলে মূলত লবিস্টদের সরকার, যারা দর কষাকষি করে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাজারে তুলে সের দরে বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছে।

দেশটার জন্য শুভ কামনা ছাড়া আর কিছু বলার নেই।

 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
 

Copyright© 2025 All reserved