দেশের বেশ কিছু ব্যাংকে বেজে উঠেছে সতর্কতার ঘণ্টা। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এখন রেড জোন বা বিপদ সীমার মধ্যে রয়েছে। তারা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছে, যা সরাসরি সাধারণ গ্রাহকের আমানতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষ করে কিছু ইসলামিক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক এই ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছে।
মূল বিষয় বোঝার জন্য ব্যাংকিং পরিভাষা দেখা জরুরি:
EDR (Advance to Deposit Ratio) প্রচলিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে
IDR (Investment to Deposit Ratio) ইসলামিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে
নিয়ম অনুযায়ী, জমাকৃত টাকার পুরোটা ঋণ দেওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ:
প্রচলিত ব্যাংক: ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৭ টাকা ঋণ দিতে পারবে।
ইসলামিক ব্যাংক: ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৯২ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে।
যখন ব্যাংকগুলো এই সীমা অতিক্রম করে ঋণ বিতরণ করে, তখন তারা নিজেদের সীমানার বাইরে চলে যায়। এর ফলে, ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নগদ থাকে না, এবং গ্রাহকরা যখন টাকা তুলতে আসেন, তখন ঝুঁকি তৈরি হয়।
উত্তরণের সম্ভাব্য পথ:
ঋণ খেলাপীদের কাছ থেকে দ্রুত টাকা আদায়:
বড় খেলাপি বা ইচ্ছাকৃত দেরিদ্র ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত নিয়ন্ত্রণ:
দুর্বল ব্যাংকের ওপর নজরদারি বাড়ানো, নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা এবং Prompt Corrective Action (PCA) কার্যকর করা।
পুনঃমূলধনীকরণ (Recapitalization) ও ব্যাংক একীকরণ:
দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা বা নতুন মূলধন যোগ করা।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা:
যোগ্য ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত পরিচালনা, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা।
আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা:
ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স শক্তিশালী করা এবং তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ঋণ খেলাপির দায় কার এবং সমাধানের পথ কি?
বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ খেলাপি একটি গুরুতর সমস্যা। তবে এই সমস্যার দায় একক নয়,এটি বহুস্তরীয় এবং অংশীদারিত্বপূর্ণ।
এই ঋণ খেলাপির জন্য দায়ির হলেন ঋণগ্রহীতা, ব্যাংকার /ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা,রাজনৈতিক প্রভাব /প্রভাবশালী ব্যক্তি।
১️)ঋণগ্রহীতা মূল দায়ী: যিনি ঋণ নিয়েছেন কিন্তু শর্ত অনুযায়ী ফেরত দিচ্ছেন না।
খেলাপি হওয়ার কারণ হতে পারে ব্যবসার ব্যর্থতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা বা ইচ্ছাকৃত প্রতারণা।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ব্যাংকিং প্রটোকল অনুযায়ী “Willful Defaulter” শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২️) ব্যাংকার/ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা:ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের দায়িত্ব ব্যাংকের কর্তাদের।
যদি তারা নিয়ম অমান্য করে অতিরিক্ত ঋণ দেন বা ঝুঁকি যাচাই না করেন, তবে তাদেরও দায় আসে।
দায়ী ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
৩️) রাজনৈতিক প্রভাব/ প্রভাবশালী ব্যক্তি:
যদি কোনো রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তি ঋণ বিতরণের জন্য চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে তাদেরও দায় থাকে।প্রমাণ সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের উচিত দায়ীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা গ্রহণ:
১️) ঋণগ্রহীতার বিরোদ্ধে মামলা দায়ের ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত,পাবলিক লিস্টে নাম প্রকাশ করা (Willful Defaulter List) এবং ব্যাংকিং সেবা সীমাবদ্ধ করা।
২️) ব্যাংকার / ব্যবস্থাপনায় দোষীদের অভ্যন্তরীণ শাস্তির ব্যবস্থা করা,যেমন সাসপেনশন, চাকরিচ্যুতি
এবং দায়িত্বহীন ঋণ অনুমোদনের জন্য ট্রেনিং ও নিয়মকানুনের কড়া বাস্তবায়ন।
৩️) রাজনীতিবিদ / প্রভাবশালী দোষী ব্যক্তিদের বিরোদ্ধে তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা,ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভাববাজি রোধে স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ঋণ খেলাপি একজনের দায় নয়, এটি ঋণগ্রহীতা, ব্যাংক, রাজনৈতিক প্রভাব এর সমন্বয়।
এর সমাধানও মালিকানা ও দায় স্পষ্ট করার মাধ্যমে।
দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সর্বস্তরীয় দায়-পরিষ্কার ব্যবস্থা জরুরি।
প্রতিটি খেলাপি ঋণই শুধু ব্যাংকের নয়, দেশের অর্থনীতির নিরাপত্তার বিষয়। তাই দায়ের স্বচ্ছতা ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণই মূল চাবিকাঠি।
ব্যাংকিং সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে সমাধানও সম্ভব নয়। ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা,এই তিনটির সমন্বয়েই ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব এবং সাধারণ গ্রাহকের আমানত নিরাপদ রাখা সম্ভব।





