চলে যাবো একদিন
মায়াবী পর্দা ঝুলিয়ে সব ক’টি জানালায়
চোখ রেখে সংগোপনে চলে যাবো একদিন।পেছনে কাঁদবে স্বজন জানাশোনা অলিগলি
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ ঝড়তোলা নীলাকাশ।এখনো সময় আছে মনের জানালা খুলে
বিধির চরণে রাখএলোমেলো ভাবনাগুলো
উড়ে উড়ে দেখতার কুদরতের খেলা
রংয়ের মানুষ তুই বিদায় নেবার আগে
মেখে নে দেহগগনে মুঠুমুঠু প্রেম।একদিন চলে যাবো সঙ্গীহীন একা
মুখরিত বাতায়ন সোনালী চশমা
কবিতার পান্ডুলিপি সখের ল্যাপটপ
অনাদরে থাকবে পড়ে প্রিয় সবমুখ
পরিবার পরিজন মাতৃভূমি।জানি একদিন চলে যাবো
এই সকালের ঘাসগুলো আর আমার পায়ের স্পর্শ পাবেনা।
জানি সেদিন ঝরে যাওয়া পাতাদের আর কেউ মাড়িয়ে ঝুরঝুর করে দেবেনা।জানি আটকে পড়া চড়ুইটাকে আর আমার মতন করে কেউ জানালা দিয়ে বের করে দেবেনা।
এই আমার আর পথ চলতে চলতে থেমে যাওয়া ঠেলাগাড়িটাকে ঠেলে দেয়া হবেনা।ইদানিং কারো উপর রাগ করিনা, আক্রোশ দেখাই না। হয়ত কিছুদিন পরেই চলে যাবো একদম সবাইকে ছেড়ে– এই মাঠ-ঘাট-প্রান্তর আর প্রিয়জনদের ছেড়ে।
সকালের স্নিগ্ধ আলোর পরশ হয়ত সেদিন চলে যাওয়া অনেকের মতন আমিও পাবো না।
রাতের এই জোছনার আলোতে পথে আমার ছায়াটাকে আলাদা করে দেখতে পাবো না। ছায়ার মাথাটাকে পা দিয়ে চেপে দেয়ার চেষ্টা করতে করতে বাসার গেটে চলে আসা হবেনা।একদিন হয়ত চাইলেও কিছুই বলতে পারবো না, শুধু অনুভব করে যাবো। হয়ত সেদিন সব বুঝেও না বলতে পারার আক্ষেপে যন্ত্রণাদগ্ধ হবো।
অথবা হয়ত একদিন কেবলি ভালোবাসা পাবো। যে ভালোবাসা পেলে আর কিছু লাগেনা! আনন্দে আর স্মিত হাসিতে কেটে যাবে অনন্তকাল।একদিন……… কতদূরেই না চলে যাবো!
ইদানিং মনে হয় আমার মৃত্যু খুব বেশী
দূরে নয়আমার অভিধানের চেনা শব্দগুলো
ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে,
স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে,
চেনা মুখগুলো অচেনা হয়ে যাচ্ছে।
নিম্ন সংস্কৃতির মানুষের ভীড়ে
নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হচ্ছে।
মুগ্ধ চাঁদ,স্বাস্থ্যবান জ্যোৎস্নাও আলোহীন।
রাতের আঁচল ছুঁয়ে উড়ছে হিমায়িত অন্ধকার।
দেহের প্রাচীরে ঝুলানো আছে দুঃস্বপ্নের তাবিজ।
দীর্ঘশ্বাস দহনে ভস্ম হয় স্বপ্নগুলো।
মনে হয় যেন একটা নির্দয় পৃথিবীতেই
বসবাস করছি।
সহস্রাব্দের নিষ্ঠুরতা আমাকে অনুক্ষণ
ক্ষত বিক্ষত করছে;আমি ঘুমুতে পারিনা।চারিদিকের জৌলুস ভীষণ ম্লান মনে হয়,
মায়াবী চাঁদকেও বিষন্ন মনে হয়।
পেশাকে মনে হয় নৈতিকতা বিবর্জিত
বৈষম্যের এক যান্ত্রিক জীবন।
এখন আর কারো মায়াবী গল্পে বিভোর হইনা।চারিদিকে দূষিত বাতাস,মরিচীকা আর
অন্যায়ের অশুভ প্রতিযোগিতা।
মৃত্যু আমাকে নিরন্তর হাতছানি দেয়।
হয়তো আমিও মৃত্যুর দু’সেকেন্ড দূরেই
দাঁড়িয়ে আছি।আমার মৃত্যুর পর সবকিছুই স্বাভাবিক থাকবে
কলেজ পড়ুয়া তরুণীরা বরাবরের মতই মুখরিত
আনন্দে প্রধান সড়ক দিয়ে হেঁটে যাবে,
বাতাসে তাদের বেণী দুলবে নিয়মিত ছন্দে।
মুঠোফোনে, এসএমএসে, ইমেইলে বিনিময় হবে হৃদয়ের মৌলিক ভাষা।
আমার মৃত্যুর পর শহরের প্রতিটি রাস্তায়
ট্রাফিক সিগনালগুলো নিয়মিত বিরতিতে জ্বলবে নিভবে
যান্ত্রিক সময় নির্ধারক একমুহুর্তও এদিক ওদিক করবে না।
আমার মৃত্যুর পর সিনেমাহলগুলোতে উপচে পড়া ভীড়ের কমতি হবে না
বক্স অফিসে নতুন নতুন হিট ছবি নতুন আয়োজনে আসতেই থাকবে;
সন্ধ্যার পর জেগে উঠবে মার্কেট, পার্ক, নিষিদ্ধ আনন্দের ঘর।
আমার মৃত্যুর পর শহরের প্রতিটি অলিগলিতে হবে স্বাভাবিক কলরব,
লেকের পাড়ের ঝুলন্ত রেস্তোরায় হাসবে সদ্য প্রেমে পড়া তরুণ তরুণীরা,
কোথাও সুনসান নিরবতা নামবে না, যেমন নেমেছিলো এক কারফিউর রাত্রিতে।
আমার মৃত্যুর পর আন্তর্জালের জগতে আলোড়ন উঠবে না,
সার্চের ঘরে কৌতুহলী কেউ লিখবে না নাম, জানতে চাইবে না
ঐ মায়ার জগতে আমার কোন অনুভূতি ছড়ানো আছে কি না।আমার মৃত্যুর পর স্বজনরা কাঁদবে, ওদের কান্নাটাই স্বাভাবিক
— ওটা অস্বাভাবিক নয়, ভীষণ রকম প্রত্যাশিত।
আমার মৃত্যুর পর সবকিছুই স্বাভাবিক থাকবে
কেবল অস্বাভাবিক হবে এক জোড়া জীবিত চোখ
একদিন যে চোখে উপেক্ষার বাণী ছিলো, ছেড়ে যাবার
তাড়না ছিলো, সেই জোড়া চোখ ম্লান হবে মুহুর্তের অপরাধবোধে…
