মোটা শরীর যা আজকাল অনেক মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এটি শুধু শারীরিক সৌন্দর্যের উপরই প্রভাব ফেলে না, বরং শরীরের স্বাস্থ্যেও নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ এবং সিস্টেমে সমস্যা তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
মোটা শরীরের কারণে যে সমস্যা হতে পারে:
হৃদরোগ (Heart Disease): অতিরিক্ত ওজন বা মোটা শরীর হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। অতিরিক্ত চর্বি এবং মেদ রক্তনালীতে ব্লক সৃষ্টি করে, যার ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, এবং উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) এর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
মোটা শরীরের কারণে *কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes): অতিরিক্ত মেদ শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিস সৃষ্টি করতে পারে। ডায়াবেটিসের ফলে শরীরের গ্লুকোজ (শর্করা) নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হতে পারে। মোটা শরীর ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে, যার ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis): অস্টিওআর্থ্রাইটিস হল একটি জয়েন্ট ডিজিজ, যেখানে হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা এবং ক্ষতি হয়। অতিরিক্ত ওজন জয়েন্টে চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে হাঁটু, কোমর এবং পিঠের জয়েন্টে, যা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। মোটা শরীরের কারণে হাড়ের ক্ষয় এবং অস্থিরতা বাড়ে, যা শারীরিক গতিশীলতা কমিয়ে দেয়।
শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা (Breathing Problems): মোটা শরীরের কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মেদ ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। অ্যাপনিয়া (sleep apnea) বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, যেখানে ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, এটি সাধারণত মোটা শরীরের কারণে হয়ে থাকে। হাঁপানি এবং অ্যাসমা এর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
কিডনি সমস্যা: অতিরিক্ত মেদ কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। মোটা শরীরের কারণে কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এবং কিডনি ফেইলিউর বা কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ক্যান্সার: মোটা শরীরের কারণে কিছু ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে, বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার, কলোরেক্টাল ক্যান্সার, গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার এবং গলব্লাডার ক্যান্সার। অতিরিক্ত চর্বি শরীরে অ্যানড্রোজেন এবং ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত করতে পারে, যা ক্যান্সারের বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: মোটা শরীর আত্মবিশ্বাস কমাতে পারে এবং মনের অবস্থা প্রভাবিত করতে পারে। এটি ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি এবং স্ট্রেস বাড়াতে পারে।সমাজে বা পারিবারিক পরিবেশে শারীরিক চেহারার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অনুভূতির অবমূল্যায়ন সৃষ্টি করতে পারে, যা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
হরমোনাল সমস্যা: মোটা শরীরের কারণে *হরমোনাল ইমব্যালান্স* হতে পারে, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)। এটি মহিলাদের মধ্যে মাসিক চক্রের সমস্যা, অস্বাভাবিক হরমোনের মাত্রা এবং ফলস হরমোন তৈরি করতে পারে। পুরুষদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমাতে পারে।
লিভার সমস্যা: মোটা শরীরের কারণে ফ্যাটি লিভার বা লিভার ফ্যাটি ডিগেনারেশন হতে পারে, যেখানে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফ্যাটি লিভারের সমস্যা *লিভার সিরোসিস* এর দিকে যেতে পারে।
দৃষ্টি শক্তির সমস্যা: মোটা শরীরের কারণে ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা চোখের রেটিনার ক্ষতি করতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। এটি ম্যাকুলার ডিস্ট্রফি এবং ক্যাটারেক্ট সৃষ্টি করতে পারে।
হরমোনাল পরিবর্তন: মোটা শরীর হরমোনের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি ইনসুলিন, লিপিড, এবং স্ট্রেস হরমোন এর স্তরের পরিবর্তন ঘটায়, যা শরীরের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।