প্লেনের নিয়ন্ত্রণ (Aircraft Control) এবং এর পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে বিজ্ঞান বেশ জটিল, তবে সহজ ভাষায় বললে, এটি একটি বিমানকে উড়ানোর এবং লক্ষ্যস্থলে নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন মেকানিক্যাল, প্রযুক্তিগত এবং পদার্থবিজ্ঞানের নীতির সংমিশ্রণ।
বিমান নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত কিছু মূল উপাদান এবং বৈজ্ঞানিক নীতিগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
বিমান নিয়ন্ত্রণের মৌলিক উপাদানসমূহ:
বিমান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন উপাদান কাজ করে, যেগুলি মূলত বিমানকে উড্ডয়ন, ল্যান্ডিং এবং চলন্ত অবস্থায় স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয়।
আলিরন (Ailerons):
কাজ: বিমানকে পাশের দিকে (roll) ঘোরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি প্রধানত বিমানের উইংসের প্রান্তে থাকে এবং একটি উইং উপরের দিকে, অপরটি নিচে চলে যায়, যা বিমানের ভারসাম্য বজায় রাখে।
বিজ্ঞান: বিমান উড়ন্ত অবস্থায় প্রতিটি উইংয়ের লিফট এবং ড্রাগ শক্তি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ইলেভেটর (Elevator) :
কাজ: এটি বিমানকে উপরের দিকে বা নিচের দিকে (pitch) উঠাতে সাহায্য করে। এটি সাধারণত বিমানের হরাইজন্টাল স্ট্যাবিলাইজারের পিছনে থাকে।
বিজ্ঞান: এটি বিমানের কোণ পরিবর্তন করে, যা বিমানকে উপরের দিকে বা নিচের দিকে উঠতে বা নামতে সাহায্য করে।
রুডার (Rudder):
কাজ: বিমানকে বাম বা ডানে (yaw) ঘোরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি বিমানের ভারটিকাল স্ট্যাবিলাইজারে স্থাপন করা থাকে।
বিজ্ঞান: রুডার বিমানের পেছনের দিকে থাকে এবং এটি বিমানকে বাম বা ডানে ঘোরানোর জন্য হাওয়ার প্রবাহ ব্যবহার করে।
লিফট (Lift):
বিজ্ঞান: বিমান উড্ডয়ন করার জন্য প্রধানত লিফট প্রয়োজন, যা বের্নোলি’র নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে। বের্নোলি’র নীতি বলে যে, একটি ফ্লুইডের গতির সাথে তার চাপ বিপরীতভাবে সম্পর্কিত থাকে। বিমান উইংয়ের উপরিভাগের বক্রতা কারণে, বায়ুর গতিবেগ উইংয়ের উপরের দিকে বেশি হয় এবং নিচে কম, ফলে উপরের দিকে চাপ কমে যায় এবং নিচের দিকে চাপ বৃদ্ধি পায়, যা লিফট তৈরি করে।
ফলস্বরূপ: এই পার্থক্যই বিমানকে উপরে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে।
ড্রাগ (Drag):
বিজ্ঞান: বিমান যখন উড়ছে, তখন বাতাসের প্রতিরোধকে ড্রাগ বলা হয়। এটি বিমানের গতির বিরুদ্ধে কাজ করে এবং বিমানের ইঞ্জিনের শক্তি প্রয়োজন হয় ড্র্যাগ কমাতে এবং বিমানকে দ্রুত চলতে সাহায্য করার জন্য।
ধরন: পারাসাইটিক ড্যাগ: এটি বিমানটির শরীরের বাইরের অংশের ওপর বাতাসের প্রতিরোধ থেকে আসে। ইন্ডিউসড ড্র্যাগ: এটি বিমানের লিফট সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি থেকে আসে।
থ্রাস্ট (Thrust):
বিজ্ঞান: বিমানের ইঞ্জিন বা প্রপেল্লার থেকে পাওয়া শক্তি হচ্ছে থ্রাস্ট, যা বিমানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। থ্রাস্ট এবং ড্রাগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যদি ড্র্যাগ বেশি হয়, তবে বিমানের গতি কমে যাবে।
থ্রাস্টের উৎস: আধুনিক বিমানগুলোতে জেট ইঞ্জিন বা টার্বাইন ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়, যা বাতাসে বিকিরণ শক্তি তৈরি করে।
স্ট্যাবিলিটি এবং কন্ট্রোল:
বিজ্ঞান: বিমানকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কিছু বৈজ্ঞানিক নীতি রয়েছে। বিমানকে দুটি মূলভাবে স্থিতিশীল রাখা হয়: লম্বিত স্থিতিশীলতা (Longitudinal Stability) এবং অবিচ্ছিন্ন স্থিতিশীলতা (Lateral Stability)। লম্বিত স্থিতিশীলতা (Pitch Stability): এটি নিশ্চিত করে যে বিমান একে অপরের সাথে সোজা থাকে এবং পিচ (উপর বা নিচে ওঠা) নিয়ন্ত্রণে থাকে।
অবিচ্ছিন্ন স্থিতিশীলতা (Roll Stability): এটি নিশ্চিত করে যে বিমান পাশের দিকে (roll) ঘুরে না যায়, এবং উড়ন্ত অবস্থায় ঘূর্ণন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ফ্ল্যাপস (Flaps ) :
কাজ: এটি একটি বিমান কম গতিতে উড়ানোর জন্য বা ল্যান্ডিং করার সময় ব্যবহার করা হয়। এটি বিমানের উইংয়ের প্রান্তে থাকে এবং এগুলো চালু করলে বিমানের লিফট বৃদ্ধি পায় এবং ড্রাগও বাড়ে।
বিজ্ঞান: ফ্ল্যাপস বিমানকে কম গতি হলেও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে এবং ল্যান্ডিংয়ের জন্য নিরাপদে গতি কমাতে সহায়ক।
কন্ট্রোল প্যানেল এবং ফ্লাইট ইনস্ট্রুমেন্টস:
বিজ্ঞান: আধুনিক বিমানগুলিতে ফ্লাইটের নিয়ন্ত্রণ এবং অবস্থান জানার জন্য একটি অত্যাধুনিক কন্ট্রোল প্যানেল থাকে। এই প্যানেলটি বিমানের স্পিডোমিটার, অ্যালটিটিউড, অরিয়েন্টেশন ইত্যাদি প্রদর্শন করে, যা পাইলটকে বিমান নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
অটো পাইলট সিস্টেম: কাজ: আধুনিক বিমানগুলিতে অটো-পাইলট সিস্টেম থাকে, যা পাইলটকে কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়। এটি বিমানকে নির্দিষ্ট পথ ধরে এবং নির্দিষ্ট উচ্চতায় উড়ানোর জন্য কম্পিউটারাইজড সিস্টেম ব্যবহার করে।
বিজ্ঞান: অটো-পাইলট সিস্টেমের মাধ্যমে বিমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়তে পারে এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।