সদ্য বিদায়ী বছরের ২ ডিসেম্বর ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতে কেঁপে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা। এ ঘটনার এক মাসের ব্যবধানে শুক্রবার সকালে ফের কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চল। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৫ মাত্রার। সকাল দশটা ৩২ মিনিটে মাঝারি মাত্রার ওই কম্পন রেকর্ড করা হয়। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস’র তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী ঢাকা থেকে ৪৮২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মিয়ানমারে। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ৫.৪ মাত্রার, ১৭ সেপ্টেম্বর নরসিংদী অঞ্চলে ৪ মাত্রার ও ১৪ আগস্ট সিলেট লাগোয়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এসব ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। তবে শুক্রবারের ভূমিকম্পে সিলেট মহানগরীর বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও এতে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার বিকালে আবহাওয়াবিদ রুবায়েত কবীর বলেন, ‘ঢাকা থেকে ৪৮২ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের হোমালিন নামক স্থান এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। এর প্রভাবে রাজধানীসহ উত্তর-
পূর্বাঞ্চলের সিলেট এবং এর আশপাশের কিছু এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়েছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুসারে উত্তরে তিব্বত সাব-পেস্নট, ইন্ডিয়ান পেস্নট এবং দক্ষিণে বার্মিজ সাব-পেস্নটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে আছে দেশ। উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বা বিপদের মাত্রা অনেক বেশি বলে মনে করছেন তারা। ভূমিকম্পে ঢাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, নেত্রকোনা ও দিনাজপুর অঞ্চলই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ৬৩ বার ভূমিকম্প হয়েছে। ছোট ছোট এসব ভূমিকম্পকে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের সিলেট অঞ্চলকে আগেই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েকটি পেস্নট থাকার কারণে এসব এলাকা ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। সুনামগঞ্জ, জাফলং অংশে ডাউকি ফল্টের পূব পাশে ভূমিকম্পের ঝুঁঁকি প্রবল। এসব ফল্টে ভূমিকম্প হলে ঢাকাসহ সারাদেশে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বা বিপদের মাত্রা অনেক বেশি বলে আশঙ্কা করছেন তারা। শুক্রবারের ভূমিকম্পের ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক তত্ত্বাবধায়ক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা আগে যে গবেষণা করেছি, সেখানে বলেছি যে সিলেটের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মেঘনা নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যদি একটা কাল্পনিক রেখা আঁকা হয় তাহলে এর উত্তরে যে এলাকাটি সেখানে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি জমে আছে।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের গবেষণা মতে, গত ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে তেমন বড় ভূমিকম্প হয়নি। তবে প্রায় ১৩৫ বছরের এক হিসাব ধরলে ৭ মাত্রার একটা ভূমিকম্প বাংলাদেশে হতেও পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প প্রমাণ করে যে ভূ-অভ্যন্তরে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে বড় ভূমিকম্প হওয়ার জন্য। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ডাউকি ফল্ট, পূর্বে ইস্টার্ন বাউন্ডারি ফল্ট কিংবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসামেও অনেক বড় বড় ফাটলরেখা আছে। ডাউকি ফল্ট বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে শুরু করে একটি ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা চলে গেছে ভারতের আসাম পর্যন্ত। এই ফাটলরেখাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন গবেষকরা। তাদের আশঙ্কা, যে কোনো সময় ডাউকি ফল্ট সক্রিয় হতে পারে। বিশ্লেষকরা ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি রোধে মানুষকে সচেতন করা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে আসছেন বরাবরই। তাদের ভাষ্যে- ‘ঢাকা মহানগর অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে উঠেছে। এটা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভূমিকম্প হলে আতঙ্কিত না হয়ে এই দুর্বল অবকাঠামোর মধ্যেই কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়, এ ব্যাপারে মহড়ার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’
গবেষকদের মতে, বড় ভূমিকম্পের শত বছরের মধ্যে আরেকটি বড় ভূমিকম্প হয়। দেশে সবশেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৮২২ এবং ১৯১৮ সালে মধুপুর ফল্টে। এছাড়া ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। সে হিসাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকট। এছাড়া ২০০ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে ৮টি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে একটি হয়েছিল ১৮৬৯ সালে সিলেট অঞ্চলের কাছার এলাকায়। রিখটার স্কেলে এ কম্পনের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৬। ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প, ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল, ১৯২৩ সালের দুর্গাপুরের ভূমিকম্পের এ অঞ্চল ভীষণ ঝুঁকিতে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওই ভূমিকম্পের কারণে সিলেটে বড় ধরনের ফাটলের সৃষ্টি হয়- যা এখনো রয়েছে। ‘ডাউকি ফল্টে’ অবস্থানও হওয়ায় সিলেট বড় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন। ভারতের মেঘালয়ের শিলং থেকে সিলেট হয়ে ভুটান পর্যন্ত ভূগর্ভে যে চু্যতি আছে তাতে বিপুল পরিমাণে শক্তি জমা হয়েছে। সেটি মৃদু ভূমিকম্পের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলের পেস্নটের গঠন ও মুভমেন্ট নিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই যুগের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের ইন্ডিয়া পেস্নট ও বার্মিজ পেস্নটের সংযোগস্থলে দীর্ঘসময় ধরে কোনো ভূমিকম্পের শক্তি বের হয়নি। ফলে সেখানে ৪০০ থেকে হাজার বছর ধরে শক্তি জমা হয়ে রয়েছে। গবেষণা বলছে, ইন্ডিয়া পেস্নট পূর্ব দিকে বার্মা পেস্নটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে আর বার্মিজ পেস্নট পশ্চিম দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে সেখানে যে পরিমাণ শক্তি জমা হচ্ছে তাতে আট মাত্রার অধিক ভূমিকম্প হতে পারে। আর এই মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ দেশে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে।
হায়দরাবাদ ভিত্তিক ন্যাশনাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এনজিআরআই)-এর গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর উপরিতলে থাকা বিভিন্ন পেস্নট ক্রমাগত নড়াচড়া করছে।
এর মধ্যে ভারতীয় পেস্নটটি ৫ সেমি করে সরে যাচ্ছে প্রতি বছর। এ কারণেই অস্বাভাবিকভাবে চাপ বাড়ছে হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে যা এ অঞ্চলে বড়সড় ভূমিকম্পের আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে- বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নেপালে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার। সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ওই বৈঠকে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরির সিদ্ধান্তও হয়েছিল, যারও কোনো অগ্রগতি নেই।