বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় পড়ছে—এমন উদ্বেগ তুলে ধরেছে “পরিবেশ ও প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রাম”। সংগঠনটি এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ এবং করণীয় তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল ২০২৬) নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী। ফোরামের সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. খালেদ মিসবাহুজ্জমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই’র নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন, সাংবাদিক এম নাসিরুল হকসহ অন্যরা।
বক্তারা জানান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের বড় নির্ভরতা রয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি সংকটে পড়বে। ইতোমধ্যে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তারা উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, ৬৫ শতাংশ এলএনজি এবং অর্ধেকের বেশি এলপিজি ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের জ্বালানি খাতে প্রভাব ফেলছে।
সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন কমছে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়। কৃষি খাতেও সেচ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা রয়েছে।
বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বাংলাদেশ একটি ব্যয়বহুল জ্বালানি কাঠামোর মধ্যে আটকে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করে তারা বলেন, সৌরশক্তি বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন ও কৃষিখাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি খাতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির ওপর কর-ভ্যাট প্রত্যাহার, সরকারি-বেসরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, কৃষিতে সৌরচালিত সেচ পাম্প বৃদ্ধি, গণপরিবহনে বৈদ্যুতিক যান চালু এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সংকট শুধু ঝুঁকি নয়, এটি একটি সুযোগও। এখনই সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে দেশকে।





