গর্ভাবস্থায় (pregnancy) মায়ের শারীরিক এবং মানসিক যত্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ের মধ্যে মায়ের শরীর এবং গর্ভস্থ শিশুর মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকে। মা এবং শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে কিছু বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় যা করতে হবে তা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া
গর্ভাবস্থায় সঠিক পুষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মা এবং শিশুর শরীরের উন্নতি এবং বিকাশের জন্য উপযুক্ত পুষ্টি প্রয়োজন।
প্রচুর ফল এবং শাকসবজি: ফল এবং শাকসবজি ভিটামিন, খনিজ, এবং ফাইবারের ভালো উৎস। এতে আপনার শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূর্ণ হবে।
প্রোটিন: প্রোটিন বাচ্চার সঠিক বিকাশে সাহায্য করে। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, বাদাম, এবং ডাল থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়।
ফলমূল: আনারস, কলা, আপেল, আমলকি, কমলা ইত্যাদি ফল খাওয়ার মাধ্যমে ভিটামিন সি এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
ফলমূল: খেজুর, নারকেল, আপেল, আনারস, আমলকি, টমেটো ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।
যথাযথ আয়রন ও ক্যালসিয়াম: গর্ভাবস্থায় আয়রন এবং ক্যালসিয়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ। আয়রনের জন্য সবুজ শাকসবজি, ডাল, মাংস এবং ক্যালসিয়ামের জন্য দুধ, পনির, দই খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পর্যাপ্ত পানি পান করা
গর্ভাবস্থায় শরীরের পানি এবং তরল উপাদান প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। প্রতি দিন ৬-৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত যাতে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং পেটের সমস্যাগুলি যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
ভিটামিন এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস গর্ভাবস্থায় কিছু বিশেষ ভিটামিন এবং মিনারেল গ্রহণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে: ফলিক অ্যাসিড: গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিড (ফোলেট) গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিশুদের স্নায়ু উন্নতিতে সহায়তা করে এবং স্পাইনা বিফিডা (নিচের মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিকতা) প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি সাধারণত গর্ভধারণের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিশেষভাবে প্রয়োজন।
আয়রন: আয়রন রক্তের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিস, অ্যানিমিয়া ইত্যাদি সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে।
ক্যালসিয়াম: ক্যালসিয়াম শিশুর হাড় এবং দাঁত গঠনে সহায়তা করে।
নিয়মিত ডাক্তারি চেক-আপ
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ডাক্তারি চেক-আপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিশ্চিত করে যে মা এবং শিশু দুজনেই সুস্থ আছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী: ইউসিজি পরীক্ষা (Ultrasound) এবং *রক্ত পরীক্ষা* করানো।
গর্ভকালীন টিকার গ্রহণ (যেমন টিটেনাস, ফ্লু, বা হেপাটাইটিস বি)।
গর্ভাবস্থার সময়সূচি অনুযায়ী চেকআপে যাওয়ার পরামর্শ নেওয়া।
শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যায়াম
গর্ভাবস্থায় শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলা উচিত।
হালকা হাঁটা: প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটলে শরীর সুস্থ থাকে এবং পেশী শক্তিশালী হয়।
যোগব্যায়াম: গর্ভাবস্থায় যোগ অনেক উপকারী হতে পারে, তবে গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে বা কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে যোগব্যায়ামের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গভীর শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম*: এটি মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরকে শিথিল রাখে।
যথেষ্ট বিশ্রাম ও ঘুম
গর্ভাবস্থায় শরীরের বিশ্রামের প্রয়োজন বেশি থাকে, কারণ শরীরের ভেতরে এক নতুন প্রাণের সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যাপ্ত ঘুম (প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা) এবং যথেষ্ট বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজনে দিনেও ১-২ ঘণ্টার ছোট ন্যাপ নিতে পারেন।
মানসিক শান্তি বজায় রাখা : গর্ভাবস্থায় মানসিক চাপ বা উদ্বেগ শরীর এবং শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিছু উপায় যা মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে: ধ্যান বা যোগব্যায়াম : মনকে শান্ত রাখতে এবং শরীরকে শিথিল করতে সাহায্য করে। শখের কাজ : বই পড়া, সংগীত শোনা, গল্প করা বা প্রিয় কাজগুলো করা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো*: তারা আপনাকে মানসিক সমর্থন দিতে পারে এবং গর্ভাবস্থার যাত্রা সহজ করে তুলতে পারে।
অ্যালকোহল, সিগারেট ও কফি পরিহার
গর্ভাবস্থায় অ্যালকোহল এবং সিগারেট খাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। এগুলো গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারি (আগে জন্ম নেওয়া) বা গর্ভপাত ঘটাতে পারে।
কফি এবং ক্যাফেইন : বেশি কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ করলে শিশুতে কম ওজন হতে পারে এবং কিছু শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই কফি সীমিত পরিমাণে পান করুন।
গর্ভাবস্থার জটিলতা সম্পর্কে সচেতনতা*
গর্ভাবস্থায় কিছু জটিলতা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাস্ট্রিক, ডায়াবেটিস, বা প্রি-ম্যাচিউর লেবার হতে পারে। যেকোনো ধরনের *অস্বাভাবিক লক্ষণ
যেমন:
অতিরিক্ত রক্তপাত,
তীব্র পেটের ব্যথা,
তীব্র মাথাব্যথা,
শ্বাসকষ্ট বা ফোলা পা,
হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।