ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১১ বৈশাখ, ১৪৩৩, ৬ জিলকদ, ১৪৪৭
সর্বশেষ
তোষণের রাজনীতি বাদ দিয়ে স্বীকার করুন ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সফল রূপকার শেখ হাসিনা
চট্টগ্রাম মহানগরে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন
ইউনিয়ন পর্যায়ে টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন
প্লাস্টিকমুক্ত নগর গঠনে তরুণদের আহ্বান: ধরিত্রী দিবসে ইপসার উদ্যোগ
চট্টগ্রাম জেলায় গ্রাম আদালত কার্যক্রমের মধ্যবর্তী মূল্যায়ন সম্পন্ন
সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, প্রকল্প বাতিলের দাবি
সাংবাদিকদের অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের পরিকল্পনা
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগের আহ্বান
গ্রাহকের কণ্ঠে ক্ষুদ্রঋণের বাস্তবতা: রামুতে এমআরএ গণশুনানি
জায়গা-সম্পত্তি সীমানা বিরোধে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৎ ভাইকে রক্তাক্ত যখম হামলা

প্রচ্ছদ >

জীবনধারা

তোষণের রাজনীতি বাদ দিয়ে স্বীকার করুন ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সফল রূপকার শেখ হাসিনা

 

শিরোনামটা এভাবে লিখতে চাইনি।কিন্তু যখন কোনো এমপি বা মন্ত্রী দৃশ্যমান সত্যকে অস্বীকার করে জনগণকে বোকা ভাবে, আন্ডারএস্টিমেট করে এবং দাম্ভিকতার সহিত বলেন বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংস করেছে, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে জনগণের সামনে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা আমার নৈতিকতার মধ্যে পড়ে।
সচেতন জনগণ সরকারকেও সচেতন করে তোলে।
রাজনীতিবিদদেরও সচেতন ও প্রাজ্ঞ করে।
রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস, প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত একটি গভীর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার ভেতরেই আমরা সাধারণত দুই ধরনের রাজনীতিবিদ দেখতে পাই, একদল সত্য বলার চেষ্টা করেন, আরেকদল পরিস্থিতি অনুযায়ী কথা বদলান বা অতিরঞ্জন করেন।
প্রথম শ্রেণির রাজনীতিবিদরা সাধারণত দায়িত্বশীল ও বাস্তববাদী। তারা জানেন, জনগণকে সবসময় খুশি করা সম্ভব নয়, কিন্তু সত্য বলা সম্ভব। তারা উন্নয়নকে যেমন স্বীকার করেন, তেমনি সীমাবদ্ধতাও লুকান না। এই ধরনের নেতারা জনগণকে অবমূল্যায়ন করেন না; বরং মনে করেন, মানুষ বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম। ফলে তাদের বক্তব্যে থাকে পরিমিতি, স্বচ্ছতা এবং একটি নৈতিক অবস্থান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রেণির নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়, কারণ তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে, এমন এক শ্রেণির রাজনীতিবিদও আছেন, যারা রাজনীতিকে দেখেন মূলত অবস্থান ও সুবিধা ধরে রাখার উপায় হিসেবে। তারা প্রায়ই একপাক্ষিক ভাষ্য তুলে ধরেন, কখনো অতিরঞ্জিত সমালোচনা, কখনো অন্ধ সমর্থন। তাদের বক্তব্যে বাস্তবতার চেয়ে দলীয় অবস্থান বেশি প্রাধান্য পায়। এর ফলে অনেক সময় এমন চিত্র তৈরি হয় যেখানে পূর্ববর্তী সময়ের দৃশ্যমান অর্জনগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়, অথবা বর্তমান সমস্যাগুলোকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, সমালোচনা আর অস্বীকার এক জিনিস নয়। একটি সরকারের সময় যেমন উন্নয়ন হতে পারে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বিদ্যুৎ খাতকে ধরা যায়। কোনো সময়ে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তার—এসব বাস্তব অর্জন হতে পারে। আবার অন্য সময়ে জ্বালানি সংকট, লোডশেডিং বা অর্থনৈতিক চাপও বাস্তবতা হতে পারে। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে এই দুই দিকই একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ‘সব ভালো’ বা ‘সব খারাপ’—এই ধরনের সরলীকরণ দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করে।
জনগণের বিচারও একমাত্র বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখে। বিদ্যুৎ, বাজারদর, কর্মসংস্থান—এসব বাস্তব বিষয়ই মানুষের মনোভাব গড়ে তোলে। তাই যখন কোনো বক্তব্য মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না, তখন তা সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আবার যখন কোনো নেতা সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও বাস্তব সমাধানের কথা বলেন, তখন মানুষ তার প্রতি ধৈর্য ও আস্থা দেখায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনীতি কখনোই সম্পূর্ণ সাদা-কালো নয়। এখানে আদর্শ, স্বার্থ, বাস্তবতা এবং প্রচারণা—সবকিছু মিলেই একটি জটিল চিত্র তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনগণের বুদ্ধিমত্তার প্রতি সম্মান। কারণ শেষ পর্যন্ত, মানুষ দীর্ঘমেয়াদে সেই কথাকেই গ্রহণ করে, যা তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায় এবং যুক্তির পরীক্ষায় টিকে থাকে।
বিদ্যুৎ শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয় সামাজিকভাবেও মানুষের জীবন মানের পরিবর্তন ঘটায়। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পূর্বশর্ত চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঠিক ব্যবহার। রুশ বিপ্লবের মহান নেতা লেনিনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিপ্লব কাকে বলে? লেনিন উত্তর দিয়েছিলেন, বিপ্লব হলো দ্রুত বিদ্যুতায়ন। তিনি শুধু ওটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি। সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নকে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ জারি করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সমাপ্তি পর্যায়েই ৮৭ লাখ বর্গমাইল আয়তনের বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশটির প্রায় পুরোটাই বিদ্যুতায়নের সুবিধা অর্জন করেছিল। বাংলাদেশের আয়তনের ১৫৭ গুণ বড় সোভিয়েত ইউনিয়নকে মাত্র ১৮ বছরে বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসা যে কত বড় সাফল্য ছিল, তা উপলব্ধি করা কঠিন বৈকি। অন্যদিকে মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইলের সামান্য বেশি আয়তনের বাংলাদেশকে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনতে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর ৫০ বছর লেগে গেল! তবুও জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গত এক যুগে যথাযোগ্য অগ্রাধিকার প্রদানের জন্য।
এ কথা অনস্বীকার্য সভ্যতার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নিয়ামক বিদ্যুৎ। ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর তারিখে আহসান মঞ্জিলে জেনারেটরের সহায়তায় বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে এই অঞ্চলে বিদ্যুতের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩০ সালে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথম বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা চালু হয় এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে বিতরণ করার লক্ষ্যে ‘ধানমন্ডি পাওয়ার হাউজ’ স্থাপন করা হয়। ভারত উপমহাদেশ স্বাধীনতাকালে, ১৯৪৭ এ এতদ্অঞ্চলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা চালু ছিল। তারপর ১৭ টি প্রাদেশিক জেলার শুধুমাত্র শহরাঞ্চলে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অধিকাংশ জেলাগুলিতে শুধুমাত্র রাতের বেলায় সীমিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। ঢাকায় ১৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি জেনারেটর এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। ১৯৪৮ সালে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ অধিদপ্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৫৯ সালে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা) স্থাপন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের নবদিগন্তের সূচনা হয় এবং বিদ্যুৎ খাত একটি কাঠামো লাভ করে। ১৯৬০ সালে বিদ্যুৎ অধিদপ্তরটি ওয়াপদার সাথে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মাত্রা লাভ করে। উক্ত সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অপেক্ষাকৃত বৃহৎ আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, সিদ্ধিরগঞ্জে স্থাপন করা হয় ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার স্টিম টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। একই সময়ে, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে কাপ্তাইয়ে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইউনিট স্থাপন করা হয়, যা উক্ত সময়ে বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিল। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ১৩২ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন চালু করা হয় যা এই দেশের বিদ্যুৎ বিকাশের মাইলফলক। তথাপিও দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধাবিহীন অন্ধকারেই ছিল।
সোনার বাংলা বিনির্মাণে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে রচিত মহান সংবিধানের ১৬নং অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়। যার মাধ্যমে সোনার বাংলার রূপকল্প নবরূপ পায়। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রকৌশলী সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণে বলেন যে, ‘বিদ্যুৎ ছাড়া কোন কাজ হয় না, কিন্তু দেশের জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ লোক যে শহরের অধিবাসী সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা থাকিলেও শতকরা ৮৫ জনের বাসস্থান গ্রামে বিদ্যুৎ নাই। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করিতে হইবে। ইহার ফলে গ্রাম বাংলার সর্বক্ষেত্রে উন্নতি হইবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চালু করিতে পারিলে কয়েক বছরের মধ্যে আর বিদেশ হইতে খাদ্য আমদানি করিতে হইবে না।’
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার ৫৯ (PO-৫৯) এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ৩১ মে ওয়াপদাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের এক নবদিগন্তের সূচনা করেন। ফলশ্রুতিতে সমগ্র দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের দায়িত্ব অর্পিত হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর ওপর।
১৯৭২-৭৫ এই সময়ে আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল ও সিদ্ধিরগঞ্জ তিনটি পাওয়ার হাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের অপরিসীম গুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করে ১৯৭৭ সালের অক্টোবরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) সৃষ্টি করা হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে ৭৫ পরবর্তীতে জাতির জনকের নির্মম হত্যাকান্ডের পর স্বাধীনতা বিরোধী সরকার ক্ষমতায় থাকায় বিদ্যুৎ খাতের আশাব্যঞ্জক কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশের সার্বিক অর্থনীতি তথা বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস বাড়তে থাকে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করে সে সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। লোডশেডিং ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে অবস্থা উত্তরণে শেখ হাসিনা সরকার বিদ্যুৎ খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগসহ বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কার করে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতকে আলাদা করে সংস্থা ও কোম্পানি গঠন করা হয়। বিদ্যুৎ খাতের ন্যায় জ্বালানি খাতেও কাঠামোগত সংস্কার করে নানাবিধ সংস্থা ও কোম্পানি গঠন করা হয়। ১৯৯৬-২০০১, এই সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনার লক্ষ্যে যে ভার্টিকাল সেপারেশনের মাধ্যমে সঞ্চালন খাতকে উৎপাদন ও বিতরণ খাত থেকে পৃথককরণের জন্য কোম্পানি আইনের আওতায় ১৯৯৬ সালে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড গঠন করা হয়। এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১,৬০০ থেকে ৪,৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে আইপিপি নীতি গ্রহণ করে। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎ নিয়ে আসেন। এছাড়া ক্যাপটিভ নীতি করে শিল্পে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। তখন আইপিপি করার ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যেও দ্বিধা ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে এসব সমস্যার সমাধান করেন। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ প্রায় ৫০ ভাগ। তাছাড়া বিদ্যুৎ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।
২০০১-২০০৮ পর্যন্ত বিদ্যুতের অভাবে দেশের অর্থনীতি ছিল পর্যদুস্ত, শিল্প, বাণিজ্য ছিল স্থবির এবং জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং এর কবলে মানুষের জীবন ছিল অসহনীয়। অথচ শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক ফায়দা লুটার জন্য মাইলের পর মাইল বিদ্যুতের খাম্বা আর তার লাগানো হয়েছিল।
২০০৯ সালের বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ মন্দাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন দিন বদলের সনদ ‘২০২১ রূপকল্প’। তিনি বিদ্যুৎ খাতের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিলেন ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো হবে। বাংলাদেশ হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী জাতিকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। ২০২১ এর অনেক আগেই বিদ্যুৎ সবার ঘরে পৌঁছেছে। বিদ্যুতের অগ্রযাত্রার ফলে বিশ্বের অনেক দেশকেই পিছনে ফেলে আমরা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDG) অর্জন করে সারা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছি।
বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনার সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে এক দশকে বিদ্যুৎ খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা বিগত ১০০ বছরেও হয়নি। সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রদান করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রেখে জ্বালানি বহুমুখীকরণের জন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি কয়লা, এলএনজি, তরল জ্বালানি, ডুয়েল-ফুয়েল, পরমাণু বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণসহ বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে সকলের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণকল্পে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার সুফল আমরা ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছি। বর্তমানে মোট সঞ্চালন লাইন (সার্কিট কিমি.): ১৪,৯৩৪ ; বিতরণ লাইন (কি.মি.): ৬ লক্ষ ৭৩ হাজার; মাথাপিছু উৎপাদন (কিঃওঃআঃ): ৬০২ এবং বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্ত জনগোষ্ঠী: ১০০%। তাছাড়া ১৪ হাজার ১১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প নির্মাণাধীন, ২ হাজার ৯৬১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন (LOI এবং NOA প্রদান করা হয়েছে) যেগুলো খুব শীঘ্রই কার্যক্রম শুরু করবে। তাছাড়া ৬৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে আরো ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৩ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সংরক্ষণ, মেরামত বৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের একক জ্বালানি হিসাবে গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ক্রমান্বয়ে জ্বালানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার নানাবিধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে জমির প্রাপ্যতা, পরিবহন সুবিধা এবং লোড সেন্টার বিবেচনায় নিয়ে পায়রা, মহেশখালী ও মাতারবাড়ি এলাকাকে পাওয়ার হাব হিসাবে চিহ্নিত করে একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল প্রজেক্ট, মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল প্রজেক্ট এবং পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্প। গ্যাস ও কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়াও রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় রূপপুরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কো: লি: এর উদ্যোগে পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন সফলভাবে শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনার অংশ হিসাবে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা কার্যক্রমের আওতায় ২০৪১ সালের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ হতে প্রায় ৯০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি ১১৬০ মেগাওয়াট করা হচ্ছে । নেপাল হতে বিদ্যুৎ আমদানির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে GMR এর নির্মিতব্য জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ভুটান হতে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ, ভুটান এবং ভারতের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ আমদানি নয় বরং ঋতু বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি নিয়ে কাজ চলছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দালানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন জনপ্রিয় করার জন্য ‘নেট মিটারিং গাইডলাইন’ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিগত একযুগে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করার ফলে বর্তমানে মোট সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৯২ সার্কিট কিলোমিটার এবং বিতরণ লাইনের পরিমাণ ৬ লক্ষ ০৩ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুতের সামগ্রিক সিস্টেম লস ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৬.৮৫ শতাংশ হতে প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ১১.২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
পিজিসিবি সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন সিস্টেম নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসহ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সঞ্চালন গ্রিড নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার সঙ্গে সংগতি রেখে বিদ্যুতের গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধি, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তাহলো: অনলাইনের মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থাপনা চালু, সেচকাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ; কেপিআই ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাকরণ; ই-টেন্ডারিং, ই-ফাইলিং ও সমন্বয় সভার জন্য অনলাইন-ভিত্তিক সফটওয়্যার চালুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রবর্তন; অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, মোবাইল ফোন ও অনলাইনে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ; পিএমআইএস সফটওয়্যার পদ্ধতি চালুকরণ, অডিট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বাস্তবায়ন, অনলাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন ব্যবস্থাপনা, ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎসেবা প্রদান, প্রি-পেইড মিটারিং পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে গ্রাহক সেবার মান উন্নয়নে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবিদার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ২৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার এবং বিতরণ লাইনের পরিমাণ ৬ লক্ষ ৬০ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্বারোপ করেছে। এ লক্ষ্যে Bangladesh Power Management Institute (BPMI) গঠন করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরু করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে বাংলাদেশ এখন বিদ্যুতের মান ও সেবার মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। অটোমেশন ও ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ ও গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। গ্রাহকের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার, আন্ডার গ্রাউন্ড বিতরণ ব্যবস্থা সর্বোপরি স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যুতায়নের ফলে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। এ সাফল্যের পিছনে বিদ্যুৎখাতের অবদান অনস্বীকার্য।
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে গত ৫ অক্টোবর ২০২৩। এদিন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসাবে আসা প্রথম চালানের ইউরেনিয়াম বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে (গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান) ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এ হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করল। বিশ্বে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম সদস্য বাংলাদেশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এর মধ্য দিয়ে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দুই ইউনিটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের সামগ্রিক কাজের ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে রূপপুর কেন্দ্রের দুটি ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দূষণ সৃষ্টি করে কম। কমবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও। সব মিলে বলা যায়, এ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশে ক্লিন এনার্জির মডেল হিসাবে বিবেচিত হবে, যা থেকে দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যাবে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বিদ্যুৎ। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে ২০২৫ সালের শুরুতে। প্রকল্পটি চালু হলে দেশের জিডিপিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২ শতাংশ অবদান রাখবে।
একবার পারমাণবিক জ্বালানি পাওয়ার প্ল্যান্টের চুল্লিতে লোড করা হলে এক বছরের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এরপর চুল্লিতে পুনরায় জ্বালানি লোড করতে হবে। জানা গেছে, প্রথম ইউনিট (১২০০ মেগাওয়াট) চালু করার জন্য ৭৫ টন ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হবে। একবার জ্বালানি দেওয়ার পর ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। এরপর এক-তৃতীয়াংশ ইউরেনিয়াম অর্থাৎ ২৫ টন তুলে সেখানে নতুন করে লোড দিতে হবে। এরপর আবার ১৮ মাস চলবে। এভাবে ১৮ মাস পরপর আংশিক জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। এক কেজি ইউরেনিয়াম প্রায় ১০০ টন কয়লার সমান তাপ উৎপাদনে সক্ষম। আর একই পরিমাণ তাপ তেলে উৎপাদন করতে হলে ৬০ টন ডিজেল প্রয়োজন হবে। যে কারণে এটি সহজে পরিবহনযোগ্য বিবেচনা করা হয়। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ অন্য জ্বালানিতে পেতে হলে অনবরত সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের রেডিয়েশন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। রেডিয়েশনের মাত্রা মানুষের সহনশীল ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। ২৩টি রেডিয়েশন স্টেশন চালু হবে।’
গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ে ৩ টাকা ১৩ পয়সা। এর পরই পারমাণবিক বিদ্যুৎ। এখানে প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ পড়ে ৪ টাকা ৩০ পয়সা। কয়লায় খরচ ১০ টাকা ৩১ পয়সা, সৌরবিদ্যুতে খরচ ১৫ টাকা, ফার্নেস অয়েলে ১৬ টাকা, ডিজেলে ২৮ টাকা। এক লাখ কেজি কয়লা দিয়ে যতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, শুধু এক কেজি পরমাণু জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম দিয়ে সে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচ বেশি হলেও এর আয়ু দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ। সাধারণত গ্যাস বা কয়লাচালিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুস্কাল ধরা হয় ১৫-২০ বছর; সেখানে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বনিম্ন আয়ু ধরা হয় ৫০ বছর। ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে এ কেন্দ্র থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে পরমাণুকে তেল-কয়লার মতো ফসিল ফুয়েলের বিকল্প জ্বালানি হিসেবেও দেখছে অনেক দেশ। বর্তমানে ৩০টি দেশে ৪৪৯টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ১৪টি দেশে আরও ৬৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। ২০২৫ সাল নাগাদ ২৭টি দেশে ১৭৩টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান। এগুলোর মধ্যে ৩০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে পরমাণু বিশ্বে নবাগত দেশগুলোয়, যার একটি বাংলাদেশ।
বর্তমানে দেশে ক্যাপটিভ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৭ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট। এ পর্যন্ত গত ১৯ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট। ২০০৮ সালে সরকার দায়িত্ব গ্রহণকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট ও প্রকৃত উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে তাৎক্ষণিক, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে নিবিড় তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন মহাপরিকল্পনার আওতায় উৎপাদন ক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার কার্যক্রম নিবিড় তদারকিকরণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পদক্ষেপগুলো হলো – বিদ্যুৎ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গ্রহণ; বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাৎক্ষণিক, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন; বিদ্যুৎ আইন ২০১৮ প্রণয়ন; দ্রুততার সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ প্রণয়ন প্রভৃতি। বর্তমানে দেশে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকের সংখ্যা ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪৮ জন। গত ২০২১-২২ অর্থ বছরে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মোট আয় ২৯,১০৪.৫৬ কোটি টাকা। মোট ব্যয় ২৯,২৮.৩৫ কোটি টাকা এবং নিট ক্ষতি ৫২৩.৭৯ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে বিদ্যুৎ প্রকল্প গুলোর কাজ শেষ হয়ে এসেছিল, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি-জামাত জোট সরকার সে প্রকল্পগুলো বাতিল করে দেয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সংস্কারের কাজগুলো। লোডশেডিং এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে খোদ রাজধানী ঢাকাতেই দিনে মাত্র ছয় থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকতো। শীতের সময়ও ছিল বিদ্যুতের ঘাটতি, বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে।
বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হাওয়া ভবন আর খোয়াব ভবন আলোকিত রাখতে গিয়ে সারা দেশকে অন্ধকারে রেখেছিল বিএনপি। সেই অন্ধকারময় সময় পেছনে ফেলে শেখ হাসিনা দেশবাসীকে আলোকিত বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আর্থসামাজিক সব ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্যের স্মারক রেখেছেন। যা বিশ্ব সভায় প্রশংসিত হয়েছে।
স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশকে কালো অন্ধকার গ্রাস করেছিল, সেই অন্ধকার তাড়াতে প্রথম আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সে মশাল, প্রাথমিক সংকট- সীমাবদ্ধতার পর দিকে দিকে আলোকিত করতে থাকে, শুরু হয় রাহু মুক্তির পালা। সব আবর্জনা দূর করতে প্রভাতে যেমন বাঙালি একাকার হয়, প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হয়, তেমনি এক শুভ প্রতিশ্রুতির বাতাস বইতে দেখা যায় তার দেশে ফেরার দিন থেকে। তারপর থেকে কঠোর পরিশ্রম করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ও দেশের বাহিরে সমানভাবে প্রশংসনীয়। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে আজ উন্নয়নের রোল মডেল হওয়ার সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের সকল খাতে সমানতালে উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রেখে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা ধরে রাখতে অবশ্যই শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
বাংলাদেশের বিস্ময়কর উত্থান এবং নানা প্রতিকূল পরিবেশেও এর অগ্রযাত্রা সারা বিশ্বে প্রশংসিত ও স্বীকৃত। সাহসী নারী শেখ হাসিনা সারা বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, ‘অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের উচিত বাংলাদেশকে অনুসরণ করা।’ এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়ন করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্মার্ট সরকার, স্মার্ট জনগণ, স্মার্ট অর্থনীতি ও স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নয়ন অগ্রযাত্রার স্বপ্নসারথি ও রূপকার শেখ হাসিনা যেন স্মার্ট বাংলাদেশ দেখে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ম্যাটিকুলাস ডিজাইন ও ডিপস্টেট পলিসির জ্বালে আটকে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ড.ইউনূসকে সরকার প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। ১৭/১৮ মাসের শাসনে সে দেশটাকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে উপণীত করেছে। যাওয়ার সময়ও আমেরিকার সাথে একটা গোলামী চুক্তি করে বাংলাদেশের সকল উন্নয়নকে থমকে দিয়েছে অন্যদিকে দেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এছাড়াও ড.ইউনূস প্রচুর বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ঘাড়েও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন।
এমনিতেই জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই, উৎপাদন নেই, দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি এসব কারণে সাধারণ জনগণ সরকারের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছে, তার উপর যদি এমপি, মন্ত্রীরা উলটা পালটা বেফাস কথাবার্তা বলেন তাহলে জনবিষ্ফরণকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই বলছি, ক্ষমতায় থেকে আচরণকে সংযত করাই হবে উত্তম পলিসি।

লেখক: ড.মনওয়ার সাগর, কথাসাহিত্যিক,
কলামিস্ট ও গবেষক

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০  

Copyright© 2025 All reserved